• বুধবার ২২ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪৩১

  • || ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪৫

কোন দেশের বসন্ত উৎসব কেমন?

– দৈনিক ঠাকুরগাঁও নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  

ঋতুরাজ বসন্ত মানেই উৎসব আর হাসি-আনন্দ। সে উৎসব যে শুধু আমাদের দেশেই উদযাপিত হয় এমন নয়। বসন্তের আগমনকে স্বাগত জানায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। তবে যে দেশে যে রূপেই আসুক না কেন, উৎসবের মর্মবাণী চিরন্তন। যা কিছু জীর্ণ, পুরনো, তাকে ত্যাগ করে নতুনকে বরণ করে নেওয়াই এর মূলকথা।

নানাভাবে, নানা আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয় বসন্তবরণ উৎসব। জেনে নিন কোন দেশের বসন্ত উৎসব কেমন হয়।

আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় অনেক শহরে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ পরিচিত ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’ নামে। এই ‘গ্রাউন্ডহগ’ একটি ছোট লোমশ প্রাণী, আকারে একটু বড়সড় মেঠো ইঁদুরের মতো। গর্তবাসী অন্যান্য প্রাণীর মতোই গোটা শীতকালটা এরা গর্তের মধ্যে ঘুমিয়ে কাটায়। শীতঘুম শেষে এদের বাইরে বেরিয়ে আসা দেখে অনেক কাল আগে ইউরোপে চাষিরা শীত-বসন্তের ঋতুসন্ধিতে ফসলের বীজ রোপণের জন্য জমি তৈরির উপযুক্ত সময় ঠিক করতো। সাধারণত বছরের ৩৩তম দিনে প্রজননের প্রয়োজনে ওরা গর্তের বাইরে আসে সঙ্গীর খোঁজে। যদি সে দিন চনমনে রোদ ওঠে, গ্রাউন্ডহগ নিজের ছায়া দেখতে পায়, আবার গর্তের ভিতর ঢুকে পড়ে। সে ক্ষেত্রে আরও কয়েক সপ্তাহ শীতের প্রকোপ চলতে দেখা যায়। কিন্তু যদি দিনটা থাকে মেঘলা, ওরা বাইরে এসে খানিক ছুটোছুটি করে। দেখা যায়, এর কয়েকদিনের মধ্যেই শীতের দাপট কমে গিয়ে বসন্তের ফুল ফুটতে শুরু করে। সেই থেকে এই গ্রাউন্ডহগরা ‘আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বক্তা’ হিসেবে প্রাচীন ইউরোপীয় লোকগাঁথায় জায়গা করে নিয়েছে।

জাপানে বসন্তকালে বড় চমৎকার। এ সময় ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় চেরি গাছ। চেরি ফুলকে জাপানিরা বলে ‘সাকুরা।’ এই ফুল তাদের কাছে পবিত্র, সৌভাগ্যেরও প্রতীক। ফুল ফোটার উৎসব ‘হানামি’ পালনের শুরু  হয় সেই সপ্তম শতকে। কৃষ্ণচূড়া যেমন জানুয়ারির শেষ থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্তও ফোটে, তেমনই সাকুরা অঞ্চল বিশেষে জানুয়ারি থেকে ফুটতে শুরু করলেও ‘হানামি’র আয়োজন শুরু হয় মার্চ থেকে। প্রকৃতি তখন সবচেয়ে মনোরম। ফুল-বিছানো বিরাট চেরি গাছের ছায়ায় নানা ঐতিহ্যবাহী জাপানি খাবার সহযোগে চলে বনভোজন পর্ব।

ইউরোপে বসন্ত উৎসব বেশ জমকালোভাবে আয়োজিত হয়। স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় বসন্ত-সমাগমে শুরু হয় ‘লাস ফাইয়াস’। মাতা মেরির স্বামী সেন্ট জোসেফের স্মরণে এই উৎসব। প্রতিটি এলাকায় বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই কাঠ, কাগজ, মোম প্রভৃতি দিয়ে বড় বড় পাপেট বা পুতুল তৈরির কাজ শুরু হয়। বাজি পোড়ানো হয় উৎসবে। বাজির আগুনের লাল আভায় জ্বলজ্বল করতে থাকে জিশুর জীবনের সঙ্গে জড়িত নানা চরিত্র অবলম্বনে তৈরি অতিকায় পুতুলগুলো। তাদের ঘিরে চলে নাচ, গান, শোভাযাত্রা। স্পেনে এই সময় পর্যটকদের ভিড় উপচে পড়ে। ১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে এই উৎসব।

মেক্সিকোতে বসন্ত ঋতুকে বলা হয় ‘সান মার্কোস।’ প্রতি বছর ২০-২১ মার্চ দলে দলে মানুষ ‘স্প্রিং ইকুইনক্স’ উদযাপন করতে সাদা পোশাক পরে শহর থেকে ৩০ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশাল তুতিহুয়াসান পিরামিডে সূর্যোদয় দেখতে যায়। অনেকেই ৩৬০ সিঁড়ি চড়ে পিরামিডের মাথায় পৌঁছে যায়, সূর্যের কাছাকাছি গিয়ে সারা বছরের জন্য প্রাণশক্তি শুষে নেওয়ার সংস্কারে দু’হাত তুলে রোদ পোহায়। এরপর শুরু হয়ে যায় মেলা। তিন সপ্তাহব্যাপী এই বসন্ত উৎসব মেক্সিকোর বৃহত্তম উৎসব। অগণিত পর্যটক আসেন মোরগ লড়াই, সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা ও নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান দেখতে।

পোল্যান্ডে শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয় খড়ের তৈরি অতিকায় পুতুল। শীত ঋতু, প্লেগ, মৃত্যুর দেবী মারজানার প্রতীক বলে তারা মনে করে। এই পুতুলকে না পুড়িয়ে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। শীতের ক্রোধ শান্ত করে বসন্তকে স্বাগত জানায় তারা। এই উৎসবকে বলা হয় মারজানা।

বসনিয়ায় বসন্তের অভ্যর্থনা হয় নবজীবনের প্রতীক ডিম দিয়ে। উৎসবের নাম ‘সিমবুরিজাদা।’ এর অর্থ ‘ফেস্টিভ্যাল অব স্ক্র্যাম্বল্‌ড এগ।’ বসনা নদীর ধারে সবাই একত্রিত হয়, বিনামূল্যে বিতরিত হয় ‘স্ক্র্যাম্বলড এগ।’

চীনে প্রচলিত ছিল লোকগল্প। ‘নিয়োন’ নামের এক ক্ষুধার্ত অপদেবতা দীর্ঘ শীতঘুম শেষে গ্রামে এসে ধ্বংস করত শস্য। পটাপট খেয়ে ফেলত গরু-ছাগল, এমনকি ছোট ছেলেমেয়েদেরও। তার হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রাচীন চিনের মানুষ বাড়ির দরজায় রেখে দিত সুস্বাদু খাবার, যেন সে সব খেয়ে তৃপ্ত হয়ে নিয়োন বিদায় নেয়। কিন্তু এক সময় গ্রামের মানুষ লক্ষ করলো, লাল পোশাকের একটি শিশুকে দেখে নিয়োন ভয় পেয়ে পালাচ্ছে। এরপর থেকেই নিয়োনকে ঠেকাতে শীতের শেষে সকলে লাল বা জমকালো রঙের পোশাক পরতে শুরু করল, শুরু হল লাল রঙের লণ্ঠন দিয়ে ঘর সাজানোর রীতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আধুনিক হয়েছে, প্রাচীন সংস্কার ঝেড়ে ফেলেছে, কিন্তু ঋতুসন্ধিতে নিজেদের রঙিন করে সাজিয়ে নেওয়ার প্রথাটি রয়ে গেছে আজও।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তাইল্যান্ড বসন্তকে স্বাগত জানায় ‘সংক্রান’ উৎসবের মধ্যে দিয়ে। বাংলার ‘সংক্রান্তি’ এখানে ‘সংক্রান’। বেশ মজার এই উৎসব। পানিতে নেমে পরস্পরকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া হয় এই উৎসবে। বিগত বছরের রাগ-অভিমান-হিংসা সব ধুয়ে ফেলে শুদ্ধ হয়ে ওঠাই এর উদ্দেশ্য।

হল্যান্ডে বসন্ত উৎসবের নাম হচ্ছে টিউলিপ টাইম। এই নামকরণের কারণ হচ্ছে প্রতি বছর বসন্তে প্রায় ৬ মিলিয়ন টিউলিপ ফোটে এখানে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিউলিপ উৎসব হয় হল্যান্ডেই। এটি দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ আসে হল্যান্ডে।

– দৈনিক ঠাকুরগাঁও নিউজ ডেস্ক –